দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগের নিয়মিত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়ায় হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে বগুড়ার অসংখ্য মানুষের। জেলার ১১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (এনসিডি) কর্নারে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধের ওপর নির্ভরশীল রোগীদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবছরের মতো এবারও ২৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব হার্ট দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য প্রতিটি হৃদ্স্পন্দনই জীবন। হৃদরোগ প্রতিরোধ, ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরতেই বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হৃদরোগ ও অন্যান্য কার্ডিওভাসকুলার রোগ বিশ্বে মৃত্যুর প্রধান কারণ। ২০২২ সালে এসব রোগে প্রায় ১ কোটি ৯৮ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর প্রায় ৩২ শতাংশ।
বগুড়াতেও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে এনসিডি কর্নার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় জেলার ১১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ কার্যক্রম চলছে। এখানে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের বছরজুড়ে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং জীবনযাপন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়।
রোগীদের তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণে ব্যবহার করা হচ্ছে সিম্পল অ্যাপ। নিয়মিত ফলোআপে না আসা রোগীদের ফোন করে আবারও সেবার আওতায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ রয়েছে। তবে এই কার্যক্রমে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যমতে, বগুড়া জেলায় সরকারের বরাদ্দ করা এনসিডি ওষুধের সর্বশেষ চালান এসেছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। তবে সেই চালানও রোগীদের প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল ছিল। ফলে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত প্রয়োজনীয় সব ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত চিকিৎসা, ওষুধ গ্রহণ এবং ফলোআপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে অতিরিক্ত শর্করা হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ রক্তশর্করাকে কার্ডিওভাসকুলার রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি-উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বগুড়া জেলার ১১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত সেবা গ্রহণকারী নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৫২০ জন। এর মধ্যে ৯ হাজার ৬০৭ জন শুধু উচ্চ রক্তচাপের রোগী, ৯ হাজার ৯১৩ জন উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস উভয় রোগে আক্রান্ত এবং ২০ হাজার ৯৭৩ জন শুধু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী হিসেবে তথ্য দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, নিবন্ধিত রোগীদের মধ্যে প্রায় ৬৬ শতাংশের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ১৭ শতাংশের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নেই এবং প্রায় ১৬ শতাংশ রোগী নিয়মিত ফলোআপে আসছেন না বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে।
এনসিডি কর্নারের সেবাগ্রহীতা গাবতলীর মুদিদোকানি আব্দুস সাত্তার ও রিকশাচালক রবিন মিয়া বলেন, তারা কোনোমতে দিন এনে দিন খেয়ে জীবনযাপন করেন। দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে এনসিডি কর্নার থেকে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ নিয়ে তারা উপকৃত হয়েছেন। কিন্তু কয়েক মাস ধরে দূরদূরান্ত থেকে এসে বিনামূল্যে চিকিৎসা পেলেও প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন না। দিনমজুরির আয় দিয়ে নিয়মিত ওষুধ কেনা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আগের মতো নিয়মিত ওষুধ সরবরাহের দাবি জানান তারা।
একই সংকটের কথা জানান কাহালু উপজেলার উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগে আক্রান্ত গৃহিণী মোমেনা বেগম। তিনি বলেন, প্রায় এক বছর ধরে তাকে নিয়মিত ওষুধ খেতে হচ্ছে। অথচ এনসিডি কর্নার থেকে এখন আর বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়ায় তিনি ও অন্যান্য রোগী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় সব ওষুধ নিয়মিত না পাওয়ায় অনেক রোগী ফলোআপে আসার আগ্রহ হারাচ্ছেন। এতে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই শুধু চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই নয়, রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিশ্ব হার্ট দিবসে তাই সচেতনতার পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের নিয়মিত চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এমএস/